সিসিটিভি ক্যামেরা নিরাপত্তার এক অন্যতম হাতিয়ার। তাই সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার আগে করণীয় অনেক বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা উচিত। তবে আমরা অনেকেই এই সকল বিষয়কে তেমন প্রাধান্য না দিয়েই বাজার থেকে কোনরকম সিসিটিভি ক্যামেরা কিনে নিয়ে আসি। যার ফলে সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে কাঙ্খিত নিরাপত্তা পাই না। তাই আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে CCTV ক্যামেরা কেনার আগে করণীয় এবং সিসিটিভি ক্যামেরা সম্পর্কিত সকল তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। তাহলে চলুন শুরু করা যাক-
সিসিটিভি ক্যামেরা কি
সিভিটিভি ক্যামেরা এর পূর্ণ নাম হলো ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন। সর্বপ্রথম ১৯৪২ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ালটের ব্রুচ এই ক্যামরার ডিজাইন এবং স্থাপন প্রক্রিয়া সকলের সামনে আলোচনা করেন।
আরো পড়ুনঃ ক্যামেরার দাম – ডিজিটাল ও ডিএসএলআর ক্যামেরার দাম (বিস্তারিত)
সাধারণ ক্যামেরার মতোই এটিও একটি ডিজিটাল ডিভাইস যেটি একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে এবং সেটা রেকর্ড করে।
এটিকে আই আর এমিটার এবং টেলিভিশন সেট থেকে তৈরি করা হয়। এটি মূলত সেন্সর সার্কিট থেকে পাঠানো বিদ্যুৎ সম্প্রচারের মাধ্যমে কাজ করে।
মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা সর্বপ্রথম CCTV ক্যামেরার ব্যবহার শুরু করে।
CCTV কত প্রকার
চাহিদা, প্রাইস এবং নিরাপত্তার ধরণের উপরে ভিত্তি করে CCTV ক্যামেরাগুলো বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। বর্তমানে বাজারে ৯ টি প্রকারের CCTV ক্যামেরা পাওয়া যায়। নিম্নে সিসিটিভি ক্যামেরার প্রকারভেদ উল্লেখ করা হলো
- ডোম সিসিটিভি ক্যামেরা।
- ইনফ্রারেড/ নাইট ভিশন CCTV ক্যামেরা
- বুলেট সিসিটিভি ক্যামেরা।
- PTZ প্যান টিল্ট এবং জুম CCTV ক্যামেরা
- সি-মাউন্ট সিসিটিভি ক্যামেরা।
- ডে/নাইট CCTV ক্যামেরা।
- হাই ডেফিনিশন (HD) সিসিটিভি ক্যামেরা।
- নেটওয়ার্ক / আইপি CCTV ক্যামেরা।
- ওয়্যারলেস CCTV ক্যামেরা।
সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার আগে করণীয়
বাজারে বিভিন্ন প্রকারের এবং বিভিন্ন মডেলের সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তাই সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার আগে অবশ্যই কিছু বিষয় খেয়াল রেখে CCTV ক্যামেরা কিনতে হবে।
নিম্নে CCTV ক্যামেরা কেনার আগে করণীয় বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো
সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ রেঞ্জ
CCTV ক্যামেরা কেনার ক্ষেত্রে এর ফুটেজ রেঞ্জ জেনে ক্রয় করা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরার ফুটেজ রেঞ্জ যত বেশি হবে ক্যামেরা তত বেশি দূরের ছবি ধারণ করতে পারবে।
তাই সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার পূর্বে অবশ্যই ক্যামেরার ফিল্ড অফ ভিউ এবং ক্যামেরার মিটার রেঞ্জ বেশি দেখে ক্রয় করা উচিত।
তবে CCTV ক্যামেরা কেনার পূর্বে অবশ্যই কমপক্ষে ২০-২৫ মিটার রেঞ্জের ক্যামেরা কিনতে হবে।
ফুটেজের রেজুলেশন মান
সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও এর গুণগত মান কেমন হবে সেটা নির্ভর করে ক্যামেরার রেজুলেশনের উপর।
যে ক্যামেরার ভিডিও রেজুলেশন যত বেশি সেই ক্যামেরার ভিডিও কোয়ালিটিও তত ভালো হয়ে থাকে। বাজারে বিভিন্ন রেজুলেশনের ক্যামেরা পাওয়া যায়।
উন্নত মানের CCTV ক্যামেরা গুলো বর্তমানে ৭২০পিক্সেল থেকে শুরু করে ১০৮০ পিক্সেল, ১৪৪০পিক্সেল, 2K এবং 4K রেজুলেশনের ভিডিও ধারণ করতে পারে।
তবে উল্লেখ্য যে, ভিডিও রেজুলেশন যত বৃদ্ধি পাবে ক্যামেরার স্টোরেজও তত বেশি লাগবে।
মোশন ডিটেক্টর / অডিও সেন্সর
CCTV ক্যামেরার অন্যতম দুইটি ফিচার হলো মোশন ডিটেক্টর এবং অডিও সেন্সর। এই দুইটি সেন্সরের একটি ক্যামেরার রেঞ্জের মধ্যে কোন গতিশীল বস্তু/ অন্য কোন কিছু প্রবেশ করলে সেটা ডিটেক্ট করে থাকে।
এর পাশাপাশি রেকর্ড করে রাখবে এবং অন্যটি ভিডিও রেঞ্জের মধ্যকার সকল অডিও রেকর্ড করে রাখবে। তাই সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার পূর্বে অবশ্যই এই দুইটি বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে।
মেমরি কার্ড স্লট
সিসিটিভি ক্যামেরা যে সকল ভিডিও রেকর্ড করে সেগুলো মেমরি কার্ডের মাধ্যমেই সংরক্ষিত করা হয়ে থাকে।
সাধারণত বেশিরভাগ CCTV ক্যামেরার মধ্যেই ইন-বিল্ট মেমরি কার্ডের স্লট থাকে। যেগুলোতে ৩২ জিবি থেকে শুরু করে ১ টেরা বাইট অব্দি মেমরি বাড়ানোর অপশন থাকে।
তবে একদম কম দামি সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর মধ্যে ইন-বিল্ট মেমরি কার্ডের স্লট থাকে না বললেই চলে।
সেই ক্ষেত্রে ভিডিও সংরক্ষণের জন্য এক্সট্রা করে এসডি কার্ড ব্যবহার করতে হয়।
ওয়াটার প্রুফ ফ্যাসিলিটি
সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দেখার বিষয় হলো, ক্যামেরাটিতে ওয়াটার প্রুফ ফ্যাসিলিটি আছে কি না।
অনেক ক্ষেত্রেই বাহিরের নিরাপত্তার জন্য বাড়ি/অফিসের বাহিরে CCTV ক্যামেরা লাগাতে হয়।
আর এই ক্ষেত্রে অবশ্যই ওয়াটার প্রুফ রেটিং আছে এমন সিসিটিভি ক্যামেরা নির্বাচন করা উচিত। তবে রুমের মধ্যে ব্যবহার করার জন্য ওয়াটার প্রুফ রেটিং বিহীন ক্যামেরা কেনাই উত্তম।
কারণ ওয়াটার প্রুফ রেটিং ক্যামেরার দাম ওয়াটার প্রুফ বিহীন ক্যামেরাগুলোর থেকে বেশি হয়ে থাকে।
ইনফ্রারেড এল.ই.ডি সুবিধা
ইনফ্রারেড এল.ই.ডি ক্যামেরার আরেক নাম হলো নাইটভিশন ক্যামেরা। সাধারণ ক্যামেরাগুলো দিনের আলোতে ভালো ফুটেজ ধারণ করতে পারলেও রাতে এদের ভিডিও কোয়ালিটি অনেক খারাপ হয়ে যায়।
আরো পড়ুনঃ স্মার্ট টিভি রিভিউ ২০২৩ – কোন স্মার্ট টিভি আমার জন্য সেরা হবে?
তবে, যে সকল ক্যামেরাতে ইনফ্রারেড এল.ই.ডি. সেন্সর যুক্ত থাকে সে সকল ক্যামেরা রাতেও অনেক ভালো কোয়ালিটির ভিডিও ধারণ করতে পারে।
তাই সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার সময় অবশ্যই এই বিষয়টি ও মাথায় রাখতে হবে।
ওয়্যারলেস বা তারবিহীন সুবিধা
একটা সময় শুধু CCTV ক্যামেরাকে তারের মধ্য দিয়েই অপারেট করা গেলেও বর্তমানে এটি তারবিহীন ও ব্যবহার করা যায়।
এখন বাজারে ম্যাক্সিমাম ব্রান্ডেরই কিছু ক্যামেরা আছে যেগুলাতে ওয়াইফাই কানেক্ট করে মোবাইল অ্যাপ / সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায়।
তবে তারের মাধ্যমে ব্যবহৃত ক্যামেরা গুলা তারবিহীন ক্যামেরা থেকে কম ঝুকিপূর্ণ হয়ে থাকে, এবং তারবিহীন ক্যামেরা গুলোর দাম তারযুক্ত ক্যামেরার থেকে অনেক বেশি হয়ে থাকে।
ওয়ারেন্টি
সিসিটিভি কেনার আগে অবশ্যই সেটির ওয়ারেন্টি সুবিধাগুলো যাচাই করে নিতে হবে। ব্র্যান্ড এবং দামের উপর ভিত্তি করে ওয়ারেন্টি সুবিধাগুলো ভিন্ন হয়ে থাকে।
সাধারণত কম দামের CCTV ক্যামেরাগুলো এক বছরের ওয়ারেন্টি যুক্ত হয়ে থাকে এবং বেশি দামের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো তিন বছরের ওয়ারেন্টি যুক্ত হয়ে থাকে।
তবে কিছু নামিদামি ব্র্যান্ডের বেশি দামি সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি সমৃদ্ধ হয়ে থাকে।
সিসিটিভি ক্যামেরার রক্ষণাবেক্ষণ
CCTV ক্যামেরা থেকে সর্বদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য অবশ্যই প্রতিনিয়ত সিসিটিভি ক্যামেরাকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
নিম্নে সিসিটিভি ক্যামেরার রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো
- নিয়মিত সিসিটিভি ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করা।
- নিয়মিত তারের সংযোগগুলো চেক করা ।
- CCTV ক্যামেরার সাথে যে সফটওয়্যার দেওয়া থাকে সেটা প্রতিনিয়ত আপডেট দেওয়া।
- সিসিটিভির হার্ড ড্রাইভ চেক করা।
- সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজের ব্যাকআপ ফাইলগুলো চেক করা।
উপর্যুক্ত বিষয়গুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে অবশ্যই সিসিটিভি থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট পাওয়া যাবে।
সুতরাং সিসিটিভি থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট পাওয়ার জন্য বিষয়গুলো মাথায় রাখুন।
CCTV ক্যামেরার দাম
বাজারে বিভিন্ন দামের সিসিটিভি ক্যামেরা পাওয়া যায়। সাধারণত ক্যামেরার ধরণ, ভিডিও কোয়ালিটি এবং ফিচারের উপর নির্ভর করে ব্র্যান্ডগুলো তাদের ক্যামেরার দাম নির্ধারণ করে থাকে।
নিম্নে বাজারের কয়েকটি জনপ্রিয় সিসিটিভি ক্যামেরার দাম ছক আকারের দেওয়া হলো
ব্র্যান্ড | মডেল | দাম (টাকা) |
Dahua | Dahua HAC-HFW1200TH-I8 | ২,৮০০/- |
Hikvision | Hikvision DS-2CE70DF0T-MF | ২,৬০০/- |
Uniview | Uniview UAC-B112-F40 | ১,৭০০/- |
Jovision | Jovision JVS-A815-YWC | ১,৮০০/- |
ARMOR | ARMOR AR-D2B2MPH-W | ১,৮০০/- |
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ সময়ের সাথে সাথে যেহেতু বাজারের সিসিটিভির মূল্য কমে এবং বাড়ে তাই উপর্যুক্ত দামের কম বেশি হতে পারে।
আপনি চাইলে বর্তমানের সেরা ব্র্যান্ড টিপি লিংক এর টিপি লিংক ট্যাপো সি৩২০ডাব্লিউএস (TP-LINK TAPO C320WS) মডেলের সিসিটিভি ক্যামেরাটি কিনতে পারেন।
বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন-উত্তর সমূহ
প্রিয় পাঠক, এতক্ষণে আপনারা CCTV ক্যামেরা কেনার আগে করণীয় বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। আশা করছি, এই তথ্যগুলো আপনার CCTV কেনার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ভূমিকা রাখবে।
তাহলে চলুন এখন আমরা সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার আগে করণীয় বিষয়সমূহ সংক্রান্ত কিছু জরুরী প্রশ্ন-উত্তর দেখে নেই-
সিসি ক্যামেরার রেকর্ড কত দিন থাকে?
সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ড এর সময়সীমা কয়েকটি বিষয় যেমন – রেজ্যুলেশন, ফ্রেম রেট, রেকর্ডিং ফরমেট এবং রেকর্ডিং ডিভাইস এর উপর নির্ভর করে। তবে সাধারণত সিসিটিভির ফুটেজ ৩ থেকে ১২ মাস অব্দি সংরক্ষিত থাকে।
আউটডোর সিকিউরিটি ক্যামেরা কেনার সময় কি কি দেখবেন?
আউটডোর সিকিউরিটি ক্যামেরা কেনার সময় অবশ্যই ওয়াটার প্রুফ রেটিং, ভিডিও কোয়ালিটি, ফুটেজ রেঞ্জ এবং ইনফ্রারেড এলইডি আছে কিনা এই বিষয়গুলো দেখতে হবে।
মন্তব্য
CCTV ক্যামেরা নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার আগে করণীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে একটি শক্তিশালী ও অধিক নিরাপত্তাযুক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ক্রয় করা উচিত।
কেননা, একটি ভালো মানের CCTV ক্যামেরা অবশ্যই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম।
আরো পড়ুনঃ জুম স্কাইপ গুগল মিট এ স্ন্যাপ ক্যামেরা ফিল্টারের ব্যবহার
আশা করছি, আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে CCTV ক্যামেরা কেনার আগে করণীয় বিষয় এবং সিসিটিভি ক্যামেরা সম্পর্কিত সকল বিষয় বিস্তারিতভাবে বুঝতে পেরেছেন।
এছাড়াও, CCTV ক্যামেরা সম্পর্কিত যদি আরও কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তবে অবশ্যই তা কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে পারেন।
আপনাদের সকলের সু-স্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত বিদায় নিচ্ছি, আল্লাহ্ হাফেজ।